
মনোহরগঞ্জ (কুমিল্লা) সংবাদদাতা:
ঐতিহ্য ও ইতিহাস রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতা আবারও প্রমাণ করেছে—জনতার শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে ১৬ জুন রাতে উন্মুক্ত হয়েছে উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী নবাব ফয়জুন্নেছার ঐতিহাসিক বাড়ি ও জাদুঘরের প্রবেশপথ। এটি শুধু একটি পথ উন্মুক্ত হওয়ার ঘটনা নয়, বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে জনসচেতনতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
জানা গেছে, গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাতে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁওয়ে অবস্থিত নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদারবাড়ি জাদুঘরের গেজেটভুক্ত ঐতিহাসিক প্রবেশপথ বেআইনিভাবে বন্ধ করে দেন স্থানীয় ব্যক্তি সৈয়দ আলী। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে ওয়াকফ প্রশাসন আইনগত পর্যালোচনা শেষে জাদুঘরের বন্ধ গেট খুলে দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ করে। তাদের মতে, জনসাধারণের চলাচলের পথ কোনো ব্যক্তি এককভাবে বন্ধ করতে পারেন না।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সৈয়দ আলী ৩ মার্চ ২০২৪ সালে গেটের মালিকানা দাবি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। তবে বিচারাধীন অবস্থাতেই তিনি গত ৩০ অক্টোবর ২০২৪ সালে দেয়াল নির্মাণ করে নবাববাড়ির ঐতিহাসিক প্রবেশপথ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, এ-সংক্রান্ত একটি নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) মামলা নিম্ন আদালত ইতোমধ্যে খারিজ করে দিয়েছে।
লাকসাম পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, গেট বন্ধ করে নির্মিত দেয়ালের কোনো অনুমোদন ছিল না। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ আইনগত বিষয় যাচাই-বাছাই করে দেয়াল অপসারণ ও গেট উন্মুক্ত করার জন্য সৈয়দ আলীকে চূড়ান্ত নোটিশ দিলেও তিনি তা আমলে নেননি। পৌরসভার মতে, অনুমোদনহীন এই দেয়াল নির্মাণ এবং ঐতিহাসিক প্রবেশপথ বন্ধ করা স্থানীয় সরকার বিধিমালার পরিপন্থী।
নথিপত্র পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, সৈয়দ আলীর দলিলের চৌহদ্দি নবাববাড়ির উত্তর প্রান্তে হলেও তিনি দক্ষিণ প্রান্তের জমির ওপর মালিকানা দাবি করছেন। এছাড়া তার দলিলদাতা রফিকুল হকের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ, অথচ সৈয়দ আলী ৫ শতাংশ জমির দলিল গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগও উঠেছে।
গেট উন্মুক্ত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে মোতাওয়াল্লি সৈয়দ মাসুদুল হক বলেন, “এটি শুধু একটি গেট নয়, আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রবেশদ্বার। জনগণের সচেতন ভূমিকার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”
নবাব ফয়জুন্নেছার পিতৃবংশের উত্তরসূরি ফজলে রহমান চৌধুরী আয়াজ বলেন, “গেটটি অনেক আগেই উন্মুক্ত হওয়া উচিত ছিল। বিষয়টি নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবেও বিব্রত ছিলাম। নবাববাড়ি আমাদের সবার গর্ব ও ঐতিহ্যের অংশ।”
আইনজীবী ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, “চলাচলের পথ কেউ বন্ধ করতে পারে না। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জমির মালিক হলেও জনস্বার্থে ব্যবহৃত পথ বন্ধ করা আইনসম্মত নয়।”
স্থানীয়দের আশা, নবাব ফয়জুন্নেছার ঐতিহাসিক বাড়ি ও জাদুঘরকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হবে।