
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর বুকে একের পর এক দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে। রাতের আঁধারে নারায়ণগঞ্জ থেকে পিকআপ ভ্যানে চড়ে ঢাকায় এসে মিশন শেষ করে আবার দ্রুত আস্তানায় ফিরে যাওয়া এক অভিনব ও সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরে নিজের বাসার গেটের সামনে দুই বোনের ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এই ভয়ংকর তথ্য সামনে এসেছে।
তদন্ত ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ মে ঈদুল আজহার ছুটি শেষে গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফেরেন দুই বোন, যাদের একজন পেশায় ব্যাংকার। ভোররাত আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের বাসার গেটের সামনে পৌঁছান। রিকশা থেকে নেমে মালামালসহ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ একটি পিকআপ ভ্যান থেকে নেমে আসা চাপাতিধারী দুর্বৃত্তরা তাদের ঘিরে ধরে। মুহূর্তের মধ্যে ধারালো চাপাতি উঁচিয়ে কোপানোর ভয় দেখিয়ে তাদের কাছে থাকা মুঠোফোন, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা এবং মূল্যবান মালামালসহ ট্রলি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে চোখের পলকে পালিয়ে যায় তারা।
পরবর্তীতে এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগীদের একজন বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা দায়ের করার পর অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাবের পৃথক অভিযানে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এই চক্রের মূল দুই হোতা আনোয়ার হোসেন এবং জুয়েল ওরফে সোর্স আরিফকে। জব্দ করা হয়েছে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত পিকআপ ভ্যান, দুটি চাপাতি এবং কিছু লুটের মালামাল। আদালত ইতোমধ্যে আসামিদের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, গ্রেপ্তার হওয়া আনোয়ার ও জুয়েল আগে মোহাম্মদপুর এলাকাতেই বসবাস করত। ফলে এখানকার প্রতিটি গলি, চেকপোস্ট এবং পালানোর পথ তাদের নখদর্পণে ছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে গত প্রায় ছয় মাস ধরে তারা নারায়ণগঞ্জে বাসা ভাড়া নিয়ে আস্তানা গাড়ে। তারা রাত ২টার পর নারায়ণগঞ্জ থেকে পিকআপ নিয়ে বের হতো এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় টার্গেট ঠিক করে মাত্র কয়েক মিনিটে ছিনতাই শেষ করে আবার নারায়ণগঞ্জের আস্তানায় ফিরে যেত। এই একই কৌশলে তারা ঢাকা ও এর আশেপাশে অন্তত ১০টি বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অপরাধ চক্রের সাথে ব্যবহৃত পিকআপ ভ্যানের চালক ও মালিকও সরাসরি জড়িত। তাদেরসহ চক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তার জুয়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মাদক, ডাকাতি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনসহ পাঁচটি মামলা রয়েছে।
তবে এই ঘটনার পর সাধারণ নাগরিকদের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দেখা দিয়েছে—নিজের বাসার গেটের সামনেও যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তবে নিরাপত্তা কোথায়? উৎসবের ছুটি শেষে রাতে বা ভোরে দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে বাড়ি ফেরা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নজরদারি এবং রাতের টহল আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।