
কর্নেল (অব.) এম. আনোয়ারুল আজিম ছিলেন একাধারে দেশপ্রেমিক সেনাকর্মকর্তা, সফল শিল্পোদ্যোক্তা, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং সমাজ সংস্কারক। শিক্ষা বিস্তার, শিল্পোন্নয়ন এবং জনকল্যাণে তাঁর অসামান্য অবদান লাকসাম-মনোহরগঞ্জ তথা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তাঁকে এক অনন্য আসনে সমাসীন করেছে।
তিনি ১৯৪৭ সালে তৎকালীন লাকসাম উপজেলার (বর্তমান মনোহরগঞ্জ উপজেলা) শরীফপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আবদুল হালিম এবং মাতা আয়শা হালিম। ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। গ্রামের শান্ত পরিবেশে শৈশব কাটানো এই কৃতি পুরুষ চিতোষী আর.এম. উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে বিশেষ বৃত্তি লাভ করে লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর গৌরবময় কর্মজীবন শুরু করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে তিনি মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস (এমইএস)-এর চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রিন্সিপাল আর্মি স্টাফ কলেজসহ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কর্নেল পদে উন্নীত হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। চাকরি জীবনে ক্ষমতার অপব্যবহার না করে, বরং তিনি এলাকার বহু বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
অবসর গ্রহণের পর তিনি দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। প্রথমে সিনহা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি পোশাক শিল্পে অভাবনীয় সফলতা অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলানা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’। আলানা গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
রপ্তানি খাতে এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দুইবার জাতীয় রপ্তানি পুরস্কার লাভ করেন এবং নয়বার সিআইপি (Commercially Important Person) নির্বাচিত হন। এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-এর পরিচালক হিসেবে তিনি দীর্ঘ ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন।
কর্নেল আজিমের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল শিক্ষা ও সমাজসেবায় তাঁর নিঃস্বার্থ অবদান। নিজের উপার্জিত অর্থ বিলিয়ে দিয়ে তিনি অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
চিতোষী ডিগ্রি কলেজ
শাহ শরীফ ডিগ্রি কলেজ
শরীফপুর সাজেদুল হক উচ্চ বিদ্যালয়
নাথেরপেটুয়া আজিম বাহার একাডেমি
মনিরা আজিম একাডেমি
আয়শা হালিম হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা
ঢাকার ডেমরায় আলী আহমেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ
শুধু প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাই নয়, সরকারি অনুদান (এমপিওভুক্ত) হওয়ার আগ পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রদান করতেন। এছাড়া জনস্বার্থে চিতোষী পুলিশ ফাঁড়ি, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিস প্রতিষ্ঠার জন্যও তিনি নিজের মূল্যবান ভূমি দান করে গেছেন।
সাবেক সফল মন্ত্রী কর্নেল (অব.) আকবর হোসেনের হাত ধরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগদান করেন। ওয়ান-ইলেভেনসহ রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন প্রতিকূল ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও তিনি দলের প্রতি অনুগত এবং নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি লাকসাম ও মনোহরগঞ্জের রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন একাধারে সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং অত্যন্ত কর্মীবান্ধব নেতা।
২০২৫ সালের ৩১ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে এই মহান নেতা ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি সহধর্মিণী মনিরা আজিম, এক পুত্র, এক কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী এবং রাজনৈতিক সহকর্মী রেখে যান। লাকসাম ও মনোহরগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে ছয়টি জানাজা শেষে শরীফপুর শাহী মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
তাঁর প্রয়াণের পর, তাঁর সুযোগ্য কন্যা সামিরা আজিম দোলা বাবার আদর্শকে বুকে ধারণ করে বর্তমানে লাকসাম-মনোহরগঞ্জের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
কর্নেল (অব.) এম. আনোয়ারুল আজিম আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর কর্মময় জীবন, শিক্ষার আলো ছড়ানোর মহৎ প্রয়াস এবং সমাজসেবামূলক কাজ লাকসাম-মনোহরগঞ্জের মানুষের মাঝে তাঁকে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখবে।