
বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেট: সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সাতশত বছরের একচ্ছত্র ও অলিখিত ‘সামন্ততান্ত্রিক প্রথায়’ বড় ধরনের আঘাত হানলেন সিলেটের সাহসী জেলা প্রশাসক (ডিসি) জনাব সারওয়ার আলম। মানুষের গভীর ধর্মীয় আবেগ ও সরলতাকে পুঁজি করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা মাজারের দান-সদকা ও নজরানার কোটি কোটি টাকার অস্বচ্ছ ভাগ-বাটোয়ারার অবসান ঘটাতে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবেদন এবং পরিকল্পনা কমিশনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকে গত ১০ জুন জেলা প্রশাসকের কনফারেন্স রুমে এই সংক্রান্ত এক হাই-ভোল্টেজ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) জনাব মাসুদ রানার পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার কমিটি, মসজিদ ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির মোতাওয়াল্লী এবং ‘সরে কওম’দের তলব করা হয়। মাজারের বিভিন্ন স্থাপনা ও আয়বর্ধক উৎস থেকে আসা দৈনিক ও মাসিক কোটি কোটি টাকার কোনো সুস্পষ্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন মাজার কমিটির নেতৃবৃন্দ।
সভায় তীব্র ক্ষোভ ও দৃঢ়তা প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক জনাব সারওয়ার আলম বলেন:
“হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির সম্পদ নন, তাঁরা গোটা সিলেটবাসী তথা সমগ্র দেশের সম্পদ। তাঁরা এসেছিলেন অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাওহীদের আলো ছড়াতে। অথচ আজ তাঁদের মাজারের অর্থ নিয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।”
তিনি কড়া নির্দেশ জারি করেন যে, এখন থেকে মাজারের প্রতিটি পাই-পয়সার হিসাব সরকারি বিধি মোতাবেক শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে সংরক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত বিরতিতে জেলা প্রশাসনের কাছে তার লিখিত রিপোর্ট পেশ করতে হবে।
কেবল হিসাব তলবই নয়, প্রতি সপ্তাহে সিলেটে আসা অর্ধ লক্ষাধিক পর্যটকের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার অভাব দূর করতে জেলা প্রশাসক এক যুগান্তকারী ‘মেগা প্ল্যান’ ঘোষণা করেছেন:
নারীদের জন্য বিশেষ ফ্লোর ও আধুনিক মসজিদ: মাজার সংলগ্ন মসজিদটিকে দৃষ্টিনন্দন ও বহুতল সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন করা হবে, যেখানে নারীদের জন্য থাকবে আলাদা ইবাদত ফ্লোর।
‘বাংলাদেশের দেওবন্দ’: দরগাহ মাদরাসার মানকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হবে যেন এটি উপমহাদেশের বিখ্যাত দেওবন্দ মাদরাসার মতো আন্তর্জাতিক পরিচিতি পায়।
দুর্লভ কিতাবের বিশ্ব মারকায: দরগাহ লাইব্রেরীকে বিশ্বের বুকে দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য ইসলামিক বই ও পাণ্ডুলিপির অন্যতম প্রধান ভাণ্ডারে পরিণত করা হবে।
ঐতিহাসিক এই সংস্কার সভায় দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেট জেলা ও মহানগরের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ (মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন, মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব, মাওলানা জালাল উদ্দীন ভুইঁয়া), ওয়াকফ স্টেট এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত আলেম সমাজ ও সরকারি কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসকের এই সাহসী উদ্যোগের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
সিলেটের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের মতে, জনাব সারওয়ার আলমের এই পদক্ষেপ মাজার সংস্কৃতির নামে চলা দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে এক নতুন স্বচ্ছ অধ্যায়ের সূচনা করবে।