
একটি শিশু যখন শিক্ষার উদ্দেশ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানে যায়, তখন তার নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশের দায়িত্ব থাকে শিক্ষকদের ওপর। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের দেশের কিছু মাদ্রাসা থেকে প্রায়শই এমন পৈশাচিক ও নির্মম নির্যাতনের চিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসে, যা দেখে যেকোনো বিবেকবান মানুষের শিউরে উঠতে হয়।
প্রশ্ন জাগে—একটি ছোট বাচ্চা এমন কী অপরাধ করতে পারে, যার জন্য তাকে এভাবে পৈশাচিক কায়দায় পেটাতে হবে? এটি কোনো অবস্থাতেই ‘শাসন’ নয়, এটি স্পষ্টতই অপরাধ এবং নির্যাতন।
অনেক প্রতিষ্ঠানেই দেখা যায়, কিছু শিক্ষকের মধ্যে ছাত্রদের মারধর করার একটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি রয়েছে। যারা নিজেরা ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন করতে পারেন না, তারা শিশুদের কীভাবে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেবেন? এই ধরনের হিংস্র আচরণ শিশুদের মনের ভেতর এক গভীর ট্রমা বা ক্ষত তৈরি করে, যা তাদের পুরো জীবনকে বিষাদময় করে তোলে।
মাদ্রাসার সার্বক্ষণিক বা আবাসিক ব্যবস্থার কারণে শিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বদ্ধ এই পরিবেশের সুযোগ নিয়ে অনেক সময়:
শিশুরা নির্মম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়।
বিভিন্ন সময়ে ভয়ঙ্কর যৌন নিপীড়নের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটে, যা শিশুদের প্রকাশ করার মতো সাহস বা সুযোগ থাকে না।
অনেক শিশু মাদ্রাসার এই ভীতি দূর করতে না পেরে সেখানে যেতে চায় না, অথচ মা-বাবা বাস্তব অবস্থা না বুঝে জোর করে বা পিটিয়ে তাদের পাঠাতে চান।
ফলাফল: “এই শিশুরা না পারে সইতে, না পারে কইতে। একসময় তারা মানসিকভাবে চিরতরে অসুস্থ ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।”
মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক, যুগোপযোগী এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি:
সময়সীমা নির্ধারণ (৯টা-৫টা): স্কুলের মতো মাদ্রাসার সময়সূচিও একটি নির্দিষ্ট নিয়মে আনা উচিত। ছুটির পর ছাত্র ও শিক্ষক সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাবে, যাতে শিশুরা পারিবারিক ছায়ায় বড় হতে পারে।
আবাসিক ব্যবস্থার ওপর কঠোর নজরদারি: ডে-কেয়ার বা অনাবাসিক ব্যবস্থার দিকে জোর দেওয়া এবং যেখানে আবাসিক ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক, সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা।
মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের নিয়োগের পূর্বে এবং চাকরিকালীন সময়ে শিশু মনস্তত্ত্ব এবং আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।
ধর্ম কখনো কোনো শিশুর ওপর জুলুম বা নির্যাতন শেখায় না। যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে বা শাসনের অজুহাতে শিশুদের ওপর হাত তোলেন, তারা আসলে শিক্ষার পরিবেশকে ধ্বংস করছেন। এই নির্মমতার অবসান ঘটাতে অভিভাবক, প্রশাসন এবং সমাজ—সংশ্লিষ্ট সকলের বিবেক জাগ্রত হওয়া এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা আজ বড্ড প্রয়োজন।