শেষ বিকেলের আলোটুকু মুছে যাবার পর আকাশে একটি একটি করে তারা ফুটলো। সমুদ্রের ওপর চাঁদের ছায়া এসে পড়ল। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এভাবে জলে থাকতে থাকতে বাড়ির জন্য মন কেমন করে ওঠে রুদ্রদেবের। ও ইঞ্জিন সেকশনে কাজ করে। ডেক সেকশনে কাজ করে ওর বন্ধু ইয়াসিন আলী। জাহাজে ওর বিশেষ বন্ধু নেই।
আকাশে আলবার্টস পাখি উড়ে যায়। ডলফিন দেখতে দেখতে, উড়ুক্কু মাছ দেখতে দেখতে সময় কাটে।
ছুটিতে বাড়িতে এলে, মল্লিক বাজারে চেনা পরিচিতদের অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। ব্যস্ততার জন্য কথা বলা হয় না। কিন্তু আজ যখন জাহাজ ইস্তাম্বুল ছাড়িয়ে গভীর রাতে দুর্গম সমুদ্রে পাড়ি জমাচ্ছে, তখন অনেক সময় মনে হয়, সেদিন মিহির দাকে দেখে কথা বললাম না, অন্যায় হয়েছে ব্যাপারটা। কত ভালোবাসেন, অবশ্যই কথা বলা উচিত ছিল। মনে মনে মিহিরদার জন্য কষ্ট হয়।
আজকাল দেবপ্রিয়াকে খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে,
কলেজের দিনগুলোর কথা। সেবার এডুকেশনাল ট্যুরে দেরাদুন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
ওখানেই পরিচয় হয়েছিল দেবপ্রিয়ার সঙ্গে। ওর চোখে মুখে এমন পবিত্রতা ছিল, রুদ্র সেটা মনে করে, সারারাত ভালো করে ঘুমাতে পারিনি রুদ্র দেব।
দেবপ্রিয়া, মুগ্ধ ছিল রুদ্র দেবের প্রতি। ও তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনের কৃতী ছাত্র। আবার সেই সঙ্গে কলেজের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন। একসময় এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে লেখক বুদ্ধদেব গুহ
ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন। এখানে ক্রিকেট টিমে বহুবছর ক্রিকেট খেলে গিয়েছেন চুনী গোস্বামী।
রুদ্র একদিন সন্ধ্যে বেলায় গড়িয়াহাট মোড়ে দেবপ্রিয়াকে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল। দেবপ্রিয়া বলেছিল, তোমাকে কিন্তু ভালো খেলতে হবে। তোমার জন্য আমার যেন খুব অহংকার হয়।
রুদ্র কথা দিয়েছিল।
বলেছিল, এই হাত আমি কোনদিন ছেড়ে যাবো না।
কিন্তু ঈশ্বর সেদিন হেসেছিলেন।
দেবপ্রিয়ার বাবা অম্বরীশ বাবু সল্টলেকে সেক্টর ফাইভের এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন।
রুদ্রর কাছে সেই থেকে ভালোবাসা যেন জলাতঙ্ক।
ও জাহাজে কাজ নিয়ে বিদেশে ঘুরে বেড়ায়।
জাহাজ লন্ডনে পৌঁছলে, কদিনের জন্য ওই অঞ্চল ঘোরাঘুরি করে। কোথাও মনের মধ্যে শান্তি পায় না।
ওখানে ওক গাছের গায়ে দেবপ্রিয়ার নামটা লিখে আসে। সমুদ্রের পাড়ে বালির অক্ষরে লেখে, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারো, কিন্তু আমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না, এই কথাটা মনে রেখো প্রিয়া!
ও এখন পরস্ত্রী।পরস্ত্রীকে কি ভালো ব্যবসা সম্ভব?
ওদের জাহাজ এগিয়ে চলছিল। এখন প্রবল শীতের কাল। দূরে লাইট হাউস। দূরে কাঁচবাড়ি। ক্যাপ্টেন সংকেত পাঠিয়েছেন, সামনে জাহাজ এগোতে পারবে না।
সমুদ্র জল বরফে পরিণত হয়েছে। এবার বরফ কাটার মেশিন ব্যবহার করতে হবে।
এসব ঘটনা রুদ্রর জানা।
বরফ কাটা হলো। জাহাজ চলতে শুরু করলো। একদিন মাঝরাতে একটি তরুণী জাহাজে উঠে এলো।
মেয়েটি খুব মিশুকে। মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। সমস্ত ব্যাপারে ওর কৌতূহল। ও জাহাজে সকলের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করে। রুদ্র এক সময় ওর বন্ধু হয়ে যায়।
ও বলে, রিসার্চের কাজে আমি কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরী গিয়েছিলাম।
তোমার গবেষণার সাবজেক্ট কি?
ইন্ডিয়ানদের স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং।
কাজ করতে ভালো লাগে?
অবশ্যই। এত কালচারাল দেশ।
তারপর প্রশ্ন করে, তুমি কোথায় থাকো?
রুদ্র বলে, নাকতলা।
এবার কলকাতায় গেলে, তোমার বাড়ি যাবো। ওখানে কে আছে?
মা। আর কেউ নেই।
রুদ্র প্রশ্ন করে, তোমার নামটা বলবে?
ইয়েস, ইভলীনা ব্রুক। আমি সব সময় ব্যস্ত থাকি। গত সপ্তাহে মিশিগানে গিয়েছিলাম।
কেন, রিসার্চের কাজে?
না না, আমরা কিছু মানুষের জন্য কাজ করি। আই মিন, সোশ্যাল ওয়ার্ক।
খুব ভালো কথা।
রুদ্র, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমরা কি ভালো বন্ধু হতে পারি? আমাদের সম্পর্কটাকে স্থায়ী করা যায় না?
রুদ্র মনে মনে ভাবল, কী সাহসী মেয়ে। আমাদের দেশের মেয়েরা এদের মতো এখনো এমন সাহসী হতে পারেনি।
মুখে বললো, তোমার প্রস্রাব আমার ভালো লাগলো।
কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমাকে আমার মনের কথা বলবো।
বাট দ্য অ্যান্সার মাস্ট বি পজেটিভ।
পরদিন ক্রিসমাস ছিল। নিজের ঘরে ইভেলীনাকে ডেকে নিল রুদ্র। কেক পেস্ট্রি খাওয়া হলো। কফি খেয়ে রুদ্র একটা সিগারেট ধরালো।
এবার ইভলীনার দিকে চেয়ে বললো, আমার কিন্তু সবকিছু আগোছালো। আমাকে মানিয়ে নিতে পারবে তো?
অবশ্যই পারবো। আমি যখন তোমাকে ভালবাসি, আমি যখন তোমাকে মন দিয়েছি, সেই ভালোবাসার মন সবসময় তোমার সুখে দুঃখে, আনন্দে বেদনায়,