এদিকে সরকারদলীয় এমপিদের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ভার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এগুলো যাচাইবাছাই করার জন্য সংসদের বৈঠকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। সে কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও থাকবেন। এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত উদারতা দেখিয়ে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁরা কোনো ‘পজেটিভ রেসপন্স’ পাননি। পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে দেশের সব সমস্যার সমাধান করতে চাই। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা চাই বিরোধী দল সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করুক। তাদের যেকোনো যৌক্তিক সমালোচনা ও সহযোগিতাকে আমরা স্বাগত জানাব। সংবাদ সম্মেলনে সরকারি দলের ছয় হুইপ উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে ঐতিহাসিক কিছু সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের এই অধিবেশন জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণে আমরা উপনীত হয়েছি। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাসজীবন কাটিয়ে রাজসিক প্রত্যাবর্তনের পর তিনবারের সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের হাল ধরেন তারেক রহমান। বিএনপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে নতুন প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ করে বিপুল ভোটে দলকে নির্বাচনি বৈতরণি পার করিয়ে হয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা। নির্বাচনের শুরু থেকে সরকার গঠন পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। প্রথমবার এমপি হয়ে সংসদ নেতার গুরুদায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির নিজেও এবার প্রথমবার এমপি হিসেবে জয়লাভ করে পেয়েছেন বিরোধী দলের প্রধানের গুরুদায়িত্ব। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান থেকেই শুরু হয়ে গেছে সরকারি দল ও বিরোধী দলের দ্বন্দ্ব। সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনার মুখে বসছে সংসদ। এর ধারাবাহিকতা সংসদের প্রথম অধিবেশনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো হবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া দুই দলের সামনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার বড় চ্যালেঞ্জ।
সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথম দিনই রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া নিয়ে চলছে বিতর্ক। মন্তব্য-পাল্টা মন্তব্য। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- প্রথম দিন সংসদের সব কার্যক্রমের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে ভাষণ দেবেন। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ফ্যাসিস্টের দোসর, সংসদে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই।
সংসদ সচিবালয় জানায়, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের শোক প্রস্তাবে গুরুত্ব পাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া এবং চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের শহীদরা। তাঁদের ত্যাগ ও অবদান নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা শেষে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া আইনমন্ত্রী ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপনের পর রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে। তাঁর আগে সংসদের বিজনেস অ্যাডভাইজারি কমিটিসহ আরও কয়েকটি কমিটি হবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর অধিবেশন মুলতবি হবে। ১৫ মার্চ সংসদের মুলতবি বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনা শুরু হবে। এরপর আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অধিবেশন ১৩ দিনের জন্য মুলতবি রাখা হতে পারে। ঈদের ছুটি শেষে ২৯ মার্চ পুনরায় সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনকে ঘিরে সংসদ ভবনকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী। জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সব ধরনের অস্ত্র বহন ও সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ২০২৪ সালের জুলাই গণ অভ্যুত্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় জাতীয় সংসদ ভবন। ভাঙচুর আর লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টার তা বে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয় লুই আই কানের তৈরি সংসদ ভবনের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন কেন্দ্র করে দ্রুতগতিতে মেরামতের কাজে হাত দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ভবনের ভিতরে থাকা গুরুত্বপূর্র্ণ ব্যক্তিদের অফিস কক্ষের পাশাপাশি অধিবেশন কক্ষকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি। ওই বছরের ৯ জানুয়ারি এমপিরা শপথ গ্রহণ করেন। ১১ জানুয়ারি মন্ত্রীরা শপথ নেন। তবে জুলাই গণ অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেন।
একসঙ্গে ১৩৩ অধ্যাদেশ পেশ হচ্ছে আজ : অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস মেয়াদে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য আজ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হচ্ছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন না করা হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এই অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। এ প্রসঙ্গে সরকারি দলের চিফ হুইপ গতকাল জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
এগুলো যাচাইবাছাই করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। সে কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও থাকবেন।
সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। সংসদ চাইলে কোনো অধ্যাদেশ হুবহু পাস করতে পারে, সংশোধন করতে পারে অথবা বাতিলও করতে পারে।
জারি করা উল্লেখযোগ্য অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৪’ এবং নির্বাচন কমিশন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই এগুলো সংসদের প্রথম অধিবেশনে পেশ করা হচ্ছে, তবে জনস্বার্থ ও সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংসদ এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালনের ৫৫৯ দিনে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। এর আগে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিভিন্ন খাতে পরিবর্তন আনতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে গঠিত নবম সংসদে ১২২টি অধ্যাদেশকেই একসঙ্গে আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়। এরপর অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করে। পরে সেগুলোকে প্রক্রিয়া অনুযায়ী আইনে রূপান্তর করা হয়। অন্য অধ্যাদেশগুলো সংসদ অনুমোদন না দেওয়ায় সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিন পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশ মূলত এক ধরনের আইন, যেটি রাষ্ট্রপতি জারি করে থাকেন। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভেঙে গেলে বা সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন মনে করলে তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রয়োজনে জারি করার পর সেই অধ্যাদেশটি পরবর্তী সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্থাপন করা হয়ে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে শেষ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আলোচিত-সমালোচিত দেড় বছরের শাসনকাল। এর মধ্য দিয়ে দেশ আবার প্রবেশ করে সংসদীয় গণতন্ত্রে।








